পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি বা আম-মোক্তারনামা (Power of Attorney বা POA) হলো একটি আইনি দলিল, যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি (প্রধান) অন্য আরেকজন বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে (এজেন্ট বা আমমোক্তার) তার পক্ষে আর্থিক, আইনি বা স্বাস্থ্য বিষয়ক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেন, যা বিশেষত অনুপস্থিতি বা অক্ষমতার সময়ে কাজে লাগে; এর প্রকারভেদ আছে (সাধারণ, বিশেষ, টেকসই), এবং অপব্যবহার রোধে সুস্পষ্ট ক্ষমতা নির্ধারণ, বিশ্বস্ত এজেন্ট নির্বাচন, আইনজীবীর পরামর্শ, রেজিস্ট্রেশন এবং নির্দিষ্ট শর্তাবলী প্রয়োগ করা জরুরি।
পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি (POA)
এটি এমন একটি লিখিত আইনি দলিল, যেখানে একজন ব্যক্তি (দাতা/প্রধান) তার পক্ষে নির্দিষ্ট কাজ (যেমন: সম্পত্তি কেনাবেচা, ব্যাংক লেনদেন, মেডিকেল সিদ্ধান্ত) করার জন্য অন্য কাউকে (গ্রহীতা/এজেন্ট) আইনগত ক্ষমতা প্রদান করেন।
আম-মোক্তারনামার উদ্দেশ্য
যখন দাতা নিজে উপস্থিত থেকে কোনো কাজ সম্পন্ন করতে অপারগ হন (যেমন: বিদেশে অবস্থান, অসুস্থতা, বা কর্মব্যস্ততা), তখন তিনি মোক্তারের মাধ্যমে সেই কাজগুলো করিয়ে নিতে পারেন।
আম-মোক্তারনামা আইন
বাংলাদেশে এটি মূলত পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আইন, ২০১২ এবং এর অধীনে প্রণীত বিধিমালা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। এই আইনে আম-মোক্তারনামা নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
আম-মোক্তারনামার মাধ্যমে যে কাজগুলো করা যায়:-
- জমি ক্রয়, বিক্রয়, হস্তান্তর, বা বন্ধক রাখা।
- ব্যাংক অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করা।
- আইনি মামলা বা কার্যক্রমে দাতার প্রতিনিধিত্ব করা।
- চুক্তি সম্পাদন করা।
প্রকারভেদ
- সাধারণ পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি (General POA): এটি এজেন্টকে ব্যাপক ক্ষমতা দেয়, যেমন—আর্থিক লেনদেন, চুক্তি স্বাক্ষর, এবং ব্যবসা পরিচালনা, কিন্তু প্রধান অক্ষম হয়ে পড়লে এটি সাধারণত বাতিল হয়ে যায়।
- বিশেষ পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি (Special/Limited POA): এটি এজেন্টকে শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কিছু কাজের জন্য ক্ষমতা দেয়, যেমন—একটি নির্দিষ্ট সম্পত্তি বিক্রি করা বা কোনো একটি চুক্তি সম্পাদন করা।
- অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি (Irrevocable POA): যখন মোক্তারনামা কোনো প্রতিদান বা বিনিময়মূল্যের বিনিময়ে দেওয়া হয় এবং দাতার একক ইচ্ছায় বাতিল করা যায় না। (যেমন: ডেভেলপারের কাছে জমি হস্তান্তর)।
- টেকসই পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি (Durable POA): এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রধান মানসিকভাবে বা শারীরিকভাবে অক্ষম হয়ে পড়লেও এই দলিলটি বৈধ থাকে, যা সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধারাবাহিকতা বজায় রাখে।
- চিকিৎসাগত পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি (Medical POA): এটি স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেয়, যখন প্রধান নিজের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না।
অপব্যবহার রোধের উপায়
পাওয়ার অফ অ্যাটর্নির মাধ্যমে মোক্তার সম্পত্তির মতো মূল্যবান বিষয়ে ক্ষমতা লাভ করেন। তাই এর অপব্যবহার রোধে দাতার নিম্নলিখিত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া আবশ্যক:
ক. চুক্তি প্রণয়ন ও নিবন্ধনকালীন সতর্কতা:
১। বিশেষ মোক্তারনামা ব্যবহার: সম্ভব হলে সাধারণ মোক্তারনামার বদলে বিশেষ মোক্তারনামা ব্যবহার করুন। এতে মোক্তারের ক্ষমতা নির্দিষ্ট কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে।
২। কঠোর শর্ত আরোপ: চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করুন যে মোক্তার কী করতে পারবেন না (যেমন: নিজের নামে সম্পত্তি হস্তান্তর, উপহার দেওয়া, বা নির্দিষ্ট মূল্যের নিচে বিক্রি করা)।
৩। মেয়াদ নির্দিষ্টকরণ: চুক্তিতে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা (মেয়াদ) বেঁধে দিন। এতে মেয়াদ শেষ হওয়ার পর মোক্তারনামা আপনা আপনি বাতিল হয়ে যাবে।
৪। নিবন্ধন বাধ্যতামূলক: সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে মোক্তারনামাটি বাধ্যতামূলকভাবে নিবন্ধন করুন। নিবন্ধন ছাড়া এটি আইনি বৈধতা পাবে না এবং পরবর্তীতে বাতিল করা সহজ হবে।
২। কঠোর শর্ত আরোপ: চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করুন যে মোক্তার কী করতে পারবেন না (যেমন: নিজের নামে সম্পত্তি হস্তান্তর, উপহার দেওয়া, বা নির্দিষ্ট মূল্যের নিচে বিক্রি করা)।
৩। মেয়াদ নির্দিষ্টকরণ: চুক্তিতে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা (মেয়াদ) বেঁধে দিন। এতে মেয়াদ শেষ হওয়ার পর মোক্তারনামা আপনা আপনি বাতিল হয়ে যাবে।
৪। নিবন্ধন বাধ্যতামূলক: সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে মোক্তারনামাটি বাধ্যতামূলকভাবে নিবন্ধন করুন। নিবন্ধন ছাড়া এটি আইনি বৈধতা পাবে না এবং পরবর্তীতে বাতিল করা সহজ হবে।
খ. মোক্তার নিয়োগে সতর্কতা:
৫। বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তি নিয়োগ: এমন ব্যক্তিকে মোক্তার নিয়োগ করুন, যার সততা ও বিশ্বস্ততা সম্পর্কে আপনি শতভাগ নিশ্চিত। আত্মীয়-স্বজন বা বিশ্বস্ত পেশাদার ব্যক্তিই ভালো পছন্দ।
৬। একাধিক মোক্তার: যদি সম্ভব হয়, তবে দুইজন মোক্তার নিয়োগ করুন এবং শর্ত দিন যে তারা একত্রে (Jointly) কাজ করবেন, একা কেউ কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না।
৬। একাধিক মোক্তার: যদি সম্ভব হয়, তবে দুইজন মোক্তার নিয়োগ করুন এবং শর্ত দিন যে তারা একত্রে (Jointly) কাজ করবেন, একা কেউ কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না।
গ. তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ:
৭। নিয়মিত যোগাযোগ ও তদারকি: মোক্তার কী কাজ করছেন, তার নিয়মিত খোঁজখবর নিন এবং কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে অবগত থাকুন।
৮। লেনদেন ট্র্যাক করা: মোক্তারনামার অধীনে হওয়া আর্থিক লেনদেন বা সম্পত্তির হস্তান্তর নথিপত্র পরীক্ষা করুন।
৮। লেনদেন ট্র্যাক করা: মোক্তারনামার অধীনে হওয়া আর্থিক লেনদেন বা সম্পত্তির হস্তান্তর নথিপত্র পরীক্ষা করুন।
ঘ. চুক্তি বাতিল (Revocation):
৯। বাতিলের ক্ষমতা সংরক্ষণ: চুক্তিতে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করুন যে আপনি যেকোনো সময় লিখিত নোটিশের মাধ্যমে মোক্তারনামা বাতিল করার (Revocation) ক্ষমতা রাখেন।
১০। বাতিলের পর দ্রুত ব্যবস্থা: যদি মোক্তারনামা বাতিল করেন, তবে অবিলম্বে সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক এবং অন্যান্য পক্ষকে লিখিত নোটিশ দিন এবং তাৎক্ষণিকভাবে এটি বাতিল করে নিবন্ধন করুন।
১০। বাতিলের পর দ্রুত ব্যবস্থা: যদি মোক্তারনামা বাতিল করেন, তবে অবিলম্বে সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক এবং অন্যান্য পক্ষকে লিখিত নোটিশ দিন এবং তাৎক্ষণিকভাবে এটি বাতিল করে নিবন্ধন করুন।
কখন প্রয়োজন হয়?
- ব্যক্তি বিদেশে থাকলে বা দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকলে।
- শারীরিক বা মানসিক অক্ষমতার কারণে নিজের সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে।
- সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা বা বিক্রি করার জন্য।
এই পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করলে পাওয়ার অফ অ্যাটর্নির অপব্যবহার অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব হয় এবং এটি একটি কার্যকর আইনি হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।

0 Comments